মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেখছে বিশ্ব। এর সমান্তরালে বেড়ে চলেছে শুল্কযুদ্ধ। তুলনামূলক মন্থর প্রবৃদ্ধির ইউরোপের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে গত বছর চীনা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়ে এ যুদ্ধে নতুন রূপ দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর বিপরীতে বেইজিংও বসে নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক হুমকিতে তা বড় আকার নিয়েছে। এতে বিঘ্ন হতে পারে ইউরোপের সরবরাহ চেইন। খবর ইউরো নিউজ।
চীন সরকার দেশীয় ইভি উৎপাদকদের ভর্তুকি দিচ্ছে, এমন অভিযোগে গত বছর আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করে ইইউ। এর প্রতিক্রিয়ায় ইইউ থেকে আমদানীকৃত ব্র্যান্ডির ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করে বেইজিং। একই সঙ্গে তদন্তের মুখে পড়ে ইইউ থেকে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি।
এমন আবহের মধ্যে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক উত্তেজনা বেড়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই যা স্পষ্ট। ট্রাম্প ইইউর খাদ্য, গাড়ি ও কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। হোয়াইট হাউজে প্রবেশের আগেই ইইউ থেকে সব আমদানির ওপর ১০-২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
হোয়াইট হাউজে ফেরার প্রথম দিনে এক প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কানাডা ও মেক্সিকোর আমদানি করা পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি জ্বালানি তেল না কিনলে ইইউর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইইউ) আমাদের গাড়ি নেয় না, কৃষিপণ্য নেয় না। তারা প্রায় কিছুই নেয় না। কিন্তু আমরা তাদের গাড়ি নিই, কৃষিপণ্য নিই, অনেক কিছু নিই। তাই আমরা হয় শুল্কের মাধ্যমে এটি ঠিক করব অথবা তারা আমাদের জ্বালানি তেল কিনবে।’
ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষক আদর্শ সিনহার মতে, ইউরোপে শুল্ক বিলম্বিত হতে পারে। তবে শুল্ক আরোপ নতুন প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হতে পারে। এ অবস্থায় শুল্ক বৃদ্ধির সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউরোপে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়াবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে মতবিরোধ এবং মেধাস্বত্ব নিয়ে দেশ দুটির মাঝে অনেক দিন ধরে উত্তেজনা চলমান। এ ধরনের উত্তেজনা ইউরোপের সরবরাহ চেইনকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সরবরাহ চেইনের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার মাঝে মহামারীকালীন পরিস্থিতিকে উদাহরণ হিসেবে টানলেন ইন্টেলিজেন্স প্লাটফর্ম জিরো১০০-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা কেভিন ওমারা। তিনি বলেন, ‘একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করতে পারে। মহামারীর সময় যেমন সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তেমনি এ ধরনের যুদ্ধ সরবরাহ চেইনকে আরো জটিল ও মন্থর করে তুলতে পারে।’
এ পরিস্থিতিতে পণ্য আমদানি, রফতানি ও পরিবহন আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, যা ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেবে।
কেভিন ওমারা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যযুদ্ধ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, সৌরশক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো কিছু কৌশলগত সরবরাহ চেইনকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। ফলে সব দেশের খরচ বাড়বে, কারণ এ ভ্যালু চেইনে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিকে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ বজায় রাখতে দেশীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ করতে হবে।’
তিনি আরো যোগ করেন, যদি প্রতিশোধমূলক শুল্ক এবং অন্য শিল্পে এর আওতা বাড়তে থাকে, তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এতে যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশ উল্টোভাবে উপকৃত হতে পারে। কারণ এসব দেশ অতিরিক্ত উৎপাদন কম দামে তৃতীয় পক্ষের দেশগুলো সরবরাহ করতে পারে।
কেভিন ওমারা বলেন, ‘চীনের মতো অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ তৃতীয় পক্ষের কাছে পণ্য ডাম্পিং করতে পারে। যারা এসব উপকরণ ও উপাদান ব্যবহার করে সেসব শিল্পের জন্য ডাম্পিং উপকারী হতে পারে। তবে একই উপকরণের দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি সম্পর্কে ওমারা বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কনীতি উল্টো আশীর্বাদ হতে পারে, যদি তা সরবরাহ চেইনে অগ্রগামীদের স্থানীয় বা আঞ্চলিকভাবে সরবরাহ চেইন স্থাপন করতে উৎসাহিত করে। স্থানীয় চেইন আরো স্থিতিস্থাপক হওয়ার পাশাপাশি কম কার্বন নিঃসরণ নিশ্চিত করতে পারে।’
এদিকে শুল্কসংক্রান্ত বিরোধের জের কাজে লাগাতে প্রস্তুত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানি এরই মধ্যে নিজেদের কর্মীকে প্রশিক্ষিত করছে। তারা সরবরাহকারী ও গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করছে এবং তাদের বর্তমান সরবরাহ পুনর্মূল্যায়ন করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ চেইনের এমন সংকটে কাজে আসতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের মতো বিকাশমান হাল প্রযুক্তি।
কেভিন ওমারা জানান, বাণিজ্যশুল্ক আরো দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে শতভাগ ডিজিটাল সরবরাহ চেইন। এখন এ খাতে নেতৃত্বে থাকা দেশগুলো এআই ও রোবোটিকস ব্যবহারে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী। কারণ এসব প্রযুক্তি কার্যক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রম সংকট ও বাড়তি খরচ মোকাবেলা করতে সাহায্য করছে।